প্রতিনিধি ২৪ জুলাই ২০২৬ , ১:০৩:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ
অনলাইন ডেক্স:
মার্কিন প্রশাসন ও রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থিদের উপস্থিতি বহু দশকের বাস্তবতা। ওয়াশিংটনের ক্ষমতার করিডোরে সিদ্ধান্ত শুধু হোয়াইট হাউস বা কংগ্রেসে হয় না।
সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে অনেকগুলো লবিং সংস্থা, নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক অর্থায়ন, গণমাধ্যম, একাডেমিয়া এবং নাগরিক সংগঠন। এসব কাঠামোর মাধ্যমেই ইসরাইলপন্থিরা ব্যাপকভাবে সক্রিয়।
তারা আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটিসহ (এআইপিএসি) নানা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও সংগঠনের মাধ্যমে কাজটি করে থাকে।
সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি যাতে না হয় সেজন্য ইসরাইলপন্থিরা ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি চুক্তির পক্ষে থাকায় তার ওপর হামলার চেষ্টাও হয়েছে।
ভ্যান্স দাবি করেন, ইসরাইলের কিছু কর্মকর্তা ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে চাপ দিচ্ছেন এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি বানচাল করার চেষ্টা করছেন।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে মার্কিন প্রশাসনে ইসরাইলপন্থিরা কত শক্তিশালী কিংবা তারা রাজনীতিতে কতোটা প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাউন্টারফায়ারের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনি সংঘাতকে একদিকে চীন-রাশিয়া এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইসরাইলের মধ্যকার বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র এই পন্থাকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে।
তাদের উদ্দেশ্য হলো- সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবকে ইসরাইল, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অক্ষশক্তিতে টেনে আনা। আর এসব কার্যক্রমে রশদ যোগাচ্ছে ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ।
বিশ্বখ্যাত জননীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রকিংস ইনস্টিটিউশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল লবি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতিকে ধোঁকা দিয়েছে। ইসরাইলি স্বার্থে বুশ প্রশাসনকেও ইরাকে ঠেলে দিতে সাহায্য করেছিল এই লবিং গ্রুপ।

ইসরাইলপন্থিদের পক্ষে কাজ করে যারা
সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরাইলপন্থি লবিং সংগঠন হলো এআইপিএসি। মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক, নীতিগত অ্যাডভোকেসি এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে সংগঠনটি।
এছাড়া এ ধরণের অনেক প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা সংগঠন রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আমেরিকান জুইস কমিটি (এজেসি), এন্টি ডিফেমেশন লিগ (এডিএল), জে স্ট্রিট, ক্রিশ্চিয়ানস ইউনাইটেড ফর ইসরাইল (সিইউএফআই), কনফারেন্স অব প্রেসিডেন্টস অব মেজর আমেরিকান জুইস অরগানাইজেশনস, জায়োনিস্ট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকা (জেডওএ) ইত্যাদি সংস্থা বা সংগঠন ইসরাইলপন্থিদের পক্ষে কাজ করে থাকে মার্কিন প্রশাসনে প্রভাব সৃষ্টির জন্য।
এ ছাড়া গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু থিংক ট্যাংকও ইসরাইল-সংক্রান্ত নীতি নিয়ে কাজ করে। এগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি এবং ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ রয়েছে।
যেভাবে চাপ সৃষ্টি করে ইসরাইলপন্থিরা
মার্কিন কংগ্রেসের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলপন্থী কার্যক্রমের ধরন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ইসরাইলপন্থী কার্যক্রম মূলত লবিং সংস্থা, তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থন এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।
এসব কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, সামরিক সহায়তা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
মূলত মার্কিন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এমন প্রধান কার্যকলাপগুলোর মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিক কূটনীতি এবং জনসংযোগ। এর মাধ্যমে ইসরাইলি সরকার প্রায়শই কূটনৈতিক যোগাযোগে নিযুক্ত থাকে। জন কূটনীতি উদ্যোগে অর্থায়ন এবং নিরাপত্তা নীতির জন্য রাজনৈতিক ও জনসমর্থন জোরদার করতে মার্কিন-ভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করে লবিং গ্রুপগুলো।
মার্কিন কংগ্রেসের ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়, কংগ্রেসীয় লবিংয়ের মাধ্যমে ইসরাইলপন্থী সমর্থনকারী গোষ্ঠীগুলো বার্ষিক নিরাপত্তা সহায়তা বজায় রাখতে কার্যক্রম চালায়।
পাশাপাশি যৌথ প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি কর্মসূচিতে অর্থায়ন করতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এছাড়া সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো কৌশলগত উদ্যোগকে সমর্থন করার জন্য আইনপ্রণেতাদের কাছে তারা জোর লবিং করে।
বিভিন্ন ধরনের সমর্থনমূলক পন্থা অনুসরণ করে ইসরাইলপন্থিরা। এআইপিএসির মতো গোষ্ঠীগুলো বলিষ্ঠ নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিগুলো অনুসরণ করে। এছাড়া রয়েছে ইহুদি-আমেরিকান রাজনৈতিক অ্যাডভোকেসি ও লবিং সংস্থা ‘জে স্ট্রিট’। তারা নির্বাহী ও আইনসভা শাখার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। জে স্ট্রিট বৈদেশিক সাহায্য, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনে চাপ সৃষ্টি করে।
ইসরাইল কি যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে?
জানা যায়, ক্যাপিটল হিলে অসংখ্য ইসরাইলপন্থি লবি সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই এআইপিএসি এবং এনআরএ (ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন ) ইসরাইলের পক্ষে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে এদের কেউই ট্রাম্পকে দিয়ে ইরানে বোমা হামলা করায়নি। বরং এরা সেই ব্যবস্থার অংশ, যার মাধ্যমে করপোরেট স্বার্থ এবং সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যগুলোর আলোচনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জন মিয়ারশেইমার এবং স্টিফেন ওয়াল্ট ইসরাইলি লবি নিয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছেন। তারা মনে করেন, ইহুদি আমেরিকানরা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার জন্য বেশ কিছু প্রভাবশালী সংস্থা তৈরি করেছে। এর মধ্যে এআইপিএসি সবচেয়ে শক্তিশালী।
এ ব্যাপারে বেলফার সেন্টারে মতামত দিয়েছেন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্ট। তার মতে, মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ক শুধু কৌশলগত স্বার্থের কারণে নয়; দেশীয় রাজনীতি, লবিং ও রাজনৈতিক সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, মার্কিন নীতিনির্ধারণে একাধিক ইসরায়েপন্থি স্বার্থগোষ্ঠী একসঙ্গে কাজ করে।
‘ইসরাইল লবি’ একাই মার্কিন নীতি নির্ধারণ করে- এই বক্তব্য সমর্থন করেন না মধ্যপ্রাচ্যের সাবেক মার্কিন দূত ডেনিস রস। তার বক্তব্য, মার্কিন প্রশাসনে এআইপিএসি ও অন্যান্য সংগঠনের প্রভাব আছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সরকার শেষ পর্যন্ত নিজের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয়।
গাজা যুদ্ধের পর বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরাইল নিয়ে আগের তুলনায় বেশি মতভেদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইরান ও গাজা যুদ্ধ এবং এ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন, কাউন্টারফায়ার ও বেলফার সেন্টার


















Design & Developed by BD IT HOST