প্রতিনিধি ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ৬:৫২:২২ প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেক্স:
গাজায় চলমান ইসরাইলি আগ্রাসনকে কেন্দ্র করে চীনের খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ইয়ান শুয়েতং ও ইসরাইলের এক সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্কের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বেইজিংয়ে শিয়াংশান ফোরামে এ তর্ক-বিতর্ক হয়।
চীনের বিখ্যাত সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের ডিন ইয়ান শুয়েতংকে দেখা যায় ইসরাইলি দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাশে এলাদ শোশানের সঙ্গে তর্ক করতে। শোশান দাবি করেন, যুদ্ধের কারণ হলো ‘সন্ত্রাসী সংগঠন হামাস এখনো আমাদের জিম্মিদের ধরে রেখেছে।
জবাবে ইয়ান শুয়েতং বলেন, আপনাদের সেনাদের সন্ত্রাসীদের দিকে গুলি চালানো উচিত ছিল। শিশু নয়! নারী নয়! যখন আপনারা নারী-শিশুদের গুলি করলেন, তখনই সেই কারণ দেখিয়ে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নৈতিক বৈধতা হারালেন।
তিনি তুলনা টানেন ব্যাংক ডাকাতির সঙ্গে। প্রশ্ন তোলেন, অপরাধীদের ধরতে গিয়ে কি পুলিশ ব্যাংকের কর্মী বা গ্রাহকদের গুলি করতে পারে?
ইসরাইলের হাতে গাজায় ৭০ হাজারের বেশি সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে—এই তথ্য এলাদ শোশান অস্বীকার করেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, আমরা সব সময় চেষ্টা করি যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ইয়ান শুয়েতং পাল্টা জবাব দেন, তথ্য আপনি নির্ধারণ করবেন না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ই সেটা নির্ধারণ করবে।
এ ঘটনার পর গত সোমবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চীনের বিরুদ্ধে ইসরাইলবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, অনলাইনে ইসরাইলকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে চীন ও কাতার। জেরুজালেমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের ২৫০ জন আইনপ্রণেতার সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেন, তারা পশ্চিমা দুনিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরাইলের বৈধতাকে আক্রমণ করছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় বুধবার ইসরাইলে চীনা দূতাবাস জানায়, নেতানিয়াহুর এসব মন্তব্য ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আঘাত হেনেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইল ভুল পক্ষকে দোষ দিচ্ছে এবং ভুল সমাধান দিচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চীন-ইসরাইল সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। হামাসের হামলার পর ইসরাইলি অভিযানের নিন্দা জানায় বেইজিং। তারা বারবার ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে নেতানিয়াহু সেই সমাধান প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ইসরাইল বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে অংশ নেওয়া অল্প কয়েকটি উন্নত দেশের একটি। ২০২৩ সালে চীন ছিল ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনের ইসরাইল থেকে কেনাকাটা আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
যদিও সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত মিলেছিল গত ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’র-এর বৈঠকে। এরপর গত সপ্তাহে তেল আবিবে চীনের রাষ্ট্রদূত শিয়াও জুনঝেং বলেন, দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
কিন্তু এর একদিন পরই জাতিসংঘে চীন কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের বিমান হামলার নিন্দা জানায়। চীনা প্রতিনিধি ফু কং বলেন, ‘এটি স্রেফ দুরভিসন্ধিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ।’ পরে কাতার বেইজিংয়ে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে চীনকে ধন্যবাদ জানায়।
এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার জাতিসংঘের এক তদন্ত কমিশন জানায়, গাজায় ইসরাইল গণহত্যা চালাচ্ছে। একই দিনে ইসরাইলি সেনারা গাজা সিটিতে স্থল অভিযান ও ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, আমরা ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে, পূর্ণ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে এবং মানবিক বিপর্যয় আরও না বাড়াতে।
চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দ্রুত যুদ্ধবিরতি হলে ইসরাইলি জিম্মিদের নিরাপদে ফেরত আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, ইসরাইলের ভেতর থেকেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি সমাধানের আহ্বান উঠছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ইসরাইলের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্মান জানানো উচিত। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি জনগণের টিকে থাকা, রাষ্ট্র গঠন ও উন্নয়নের অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
চীনের মতে, টেকসই শান্তির পথ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে নিহিত, শুধু সামরিক অভিযান ও বোমাবর্ষণে নয়। তারা আশা প্রকাশ করেছে, অঞ্চলে দেশগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে এবং চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলে উত্তেজনা প্রশমনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট












Design & Developed by BD IT HOST