জাতীয়

বিতর্কের মুখে ডাক বিভাগের ই-কমার্স কমিটি স্থগিত

  প্রতিনিধি ২৫ জুন ২০২৬ , ১০:১৪:৪৮ প্রিন্ট সংস্করণ

অনলাইন ডেক্স:
গঠনের একদিন না পেরোতেই স্থগিত হলো ডাক বিভাগের ক্রস বর্ডার ই-কমার্স বিষয়ক বিশেষ কমিটি। ভবিষ্যত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণে গঠিত ১১ সদস্যের এই কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থান পেয়েছিলেন কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা।
অফিস আদেশে তাদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি বলা হলেও কোন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তার কোনো উল্লেখ নেই। ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রস বর্ডার ই-কমার্স বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় খাত। তবে এ ধরনের উদ্যোগে অংশীজন নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে প্রশ্ন উঠবেই। হঠাৎ কমিটি স্থগিত হওয়াও স্বাভাবিকভাবে কৌতূহলের জন্ম দেয়।
জানতে চাইলে ডাক বিভাগের পরিচালক (আইপিএস) মোহাম্মদ ওমর ফারুক যুগান্তরকে বলেন, প্রাথমিকভাবে কিছু অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে পরে দেখা যায়, এ খাতে কাজ করে এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। তাই সবাইকে সমান সুযোগ দিতে এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করার লক্ষ্যে কমিটির কার্যক্রম আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠক করা হবে। তাদের লিখিত প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনার পর নতুন কাঠামোয় কমিটি গঠন করা হবে।
ডাক অধিদপ্তরের নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৩ জুন আন্তর্জাতিক ডাক সার্ভিস (আইপিএস) শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
আদেশে বলা হয়, ডাক অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্রস বর্ডার ই-কমার্স সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম আরও বেগবান করার লক্ষ্যে ডাক অধিদপ্তর এবং ই-কমার্স খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই কমিটি কাজ করবে। তবে পরদিন ২৪ জুন আরেকটি অফিস আদেশে ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় অনিবার্য কারণবশত’ কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।
সূত্র বলছে, কমিটির সদস্য তালিকায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন বিভিন্ন ই-কমার্স, সফটওয়্যার, পরামর্শক ও লজিস্টিকস খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। অথচ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া, সদস্য নির্বাচনের মানদণ্ড কিংবা সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) বিষয়ে অফিস আদেশে কোনো ব্যাখ্যা ছিল না।
স্থগিত হওয়া এই কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ডাক সার্ভিস) মো. জাকির হাসান নূরকে। এছাড়া সদস্যসচিব হিসেবে ছিলেন আইপিএস শাখার কর্মকর্তা মো. শফিউল আরেফিন। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিটিতে বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি ও উদ্যোক্তাকে যুক্ত করা হয়েছিল। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন- খান হাসান মোহাম্মদ ইকবাল মাসুদ (অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিকল্পনা), ড. মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান (পরিচালক, মেইলস), মোহাম্মদ ওমর ফারুক (পরিচালক, আইপিএস), প্রকৌশলী এসএম আরিফুর রহমান (চেয়ারম্যান, ব্লু রিভার ট্রেডিং), এসএম মেহেদী চৌধুরী (ফাউন্ডার ও সিইও, লীলাবালি ডটকম), জাহাঙ্গীর আলম শোভন (চিফ কনসাল্টিং অফিসার, কনসাল প্লাস), ফাহিম ফয়সাল (স্বত্বাধিকারী, স্কাইব্রেলা), জাকারিয়া করিম (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়েব কিংডম), নাঈম চৌধুরী (ভাইস চেয়ারম্যান, ইনডেচেস সফটওয়্যার লিমিটেড)।
কমিটি গঠনের অফিস আদেশে থাকা সদস্যদের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন। কিন্তু সদস্যদের পরিচিতির জায়গায় তারা কোন সংগঠনের পক্ষে কমিটিতে রয়েছেন- তা উল্লেখ নেই। বরং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হয়ে যারা কমিটিতে রয়েছেন, তাদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। কমিটির তালিকার ৬ থেকে ১১ নম্বরে উল্লেখিত সদস্যরা তথা ডাক অধিদপ্তরের বাইরের প্রতিনিধিদের ক্রস বর্ডার ই-কমার্স সংশ্লিষ্ট ‘প্রমাণিত অভিজ্ঞতা’ নেই। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে কমিটিতে তারা রয়েছেন, সেসব প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা করলেও সরাসরি ই-কমার্স ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এর কোনটি ইন্টারনেট ডোমেইন ও ওয়েবসাইট সম্পর্কিত সেবা প্রদান করে, কোনটি আবার সফটওয়্যার সেবা প্রদান করে।
প্রথম অফিস আদেশে কমিটির দায়িত্ব হিসেবে ক্রস বর্ডার ই-কমার্স সম্প্রসারণ সংক্রান্ত বিষয়াদি আলোচনা, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। এ ধরনের কার্যক্রমে সরাসরি ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্ত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ই-ক্যাব) সাবেক এক পরিচালক বলেন, সরকারি কোনো কমিটিতে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের রাখা অস্বাভাবিক নয়। তবে তারা যদি সরাসরি ওই খাতে ব্যবসায়িকভাবে সম্পৃক্ত হন, তাহলে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে যদি কমিটি নীতিগত সুপারিশ বা ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কাঠামো নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, তাহলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে ডাক অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কমিটি গঠনের পর বিভিন্ন পর্যায় থেকে কিছু আপত্তি ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। পরে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST