সারাদেশ

ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে সিইও অপসারণে আইডিআরএর তিন চিঠিতে তিন বার্তা

  প্রতিনিধি ২৩ আগস্ট ২০২৬ , ১:০৬:৪৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে সিইও অপসারণে আইডিআরএর তিন চিঠিতে তিন বার্তা

ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আব্দুল খালেক মিয়াকে ঘিরে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের একাধিক চিঠিতে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। কোনো চিঠিতে তার অপসারণকে আইনবহির্ভূত ও অকার্যকর বলা হয়েছে, আবার পরবর্তী চিঠিতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সিইও পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। সর্বশেষ আরেক চিঠিতে তার বেতন-ভাতা কেন পরিশোধ করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে—একই বিষয়ে আইডিআরএর সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা কোথায় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন চিঠির মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হচ্ছে?
প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের উপপরিচালকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক বীমা আইন, ২০১০-এর ধারা ৮০-এর উপধারা ২ এবং বীমা কোম্পানি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা-২০১২-এর প্রবিধি ৭ লঙ্ঘন করে সিইও মো. আব্দুল খালেক মিয়াকে অপসারণ করায় তা অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। একই চিঠিতে তাকে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য করার কথা জানানো হয়।
কিন্তু প্রায় এক বছর পর ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আইডিআরএর আরেক চিঠিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, আব্দুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কোম্পানি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ২৫০তম সভায় তার চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিষয়টি আইডিআরএতে পাঠানো হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বিষয়টি আইডিআরএর ১৯৯তম সভায় উপস্থাপন করা হলে বীমা কোম্পানি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা, ২০১২-এর প্রবিধি ৭(৪) অনুযায়ী আব্দুল খালেক মিয়াকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আগে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের আরেক চিঠিতে আইডিআরএ আব্দুল খালেক মিয়ার বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার বিষয়েও ব্যাখ্যা চায়। ওই চিঠিতে তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, তিনি ছুটিতে থাকা অবস্থায় কোম্পানির পক্ষ থেকে তার চাকরির অবসানসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, শোকজের জবাব দেওয়ার পরও তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং বেতন-ভাতা প্রদান না করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এ অবস্থায় তার চুক্তির ভিত্তিতে প্রাপ্য বেতন-ভাতা কেন প্রদান করা হচ্ছে না, সে বিষয়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই বিষয়ে আইডিআরএর এসব ভিন্নমুখী চিঠি এখন সামনে আসায় বীমা খাতে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের সদস্য আবু বকর ও সুলাইমানকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কোম্পানির প্রশাসনিক ও পরিচালনা পর্ষদের বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের নামেও নানা অভিযোগ ও মামলা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির সুযোগে তার স্বাক্ষর জাল করে অথবা তার নাম ব্যবহার করে একটি মহল কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে আরো যাচাই করা করা হলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে

এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
এদিকে আগামী ২৭ আগস্ট ইসলামী ইন্সুরেন্স এর কথিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কোম্পানির কথিত সাধারণ সভা/এজিএম আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করেছেন । বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত পরিচালকদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে আইনসম্মতভাবে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ২৭ আগস্টের সভার আগে আইডিআরএর পক্ষ থেকে কোম্পানির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি পরপর ভিন্ন ব্যাখ্যা তৈরি হয়, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানি নয়, পুরো বীমা খাতের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সিইও অপসারণ, বেতন-ভাতা, পরিচালনা পর্ষদ,সাঈদ খোকন পরিবারের একাধিক পরিচালক এবং আসন্ন সাধারণ সভা—সব বিষয় একসঙ্গে পর্যালোচনা করে আইডিআরএর স্পষ্ট ও লিখিত অবস্থান প্রকাশ করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আইডিআরএর চেয়ারম্যান দ্রুত বিষয়টি সরাসরি তদারকি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন এবং চলমান বিরোধের আইনসম্মত ও স্থায়ী সমাধান করবেন।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST