সারাদেশ

বিলুপ্তির পথে সাদা বক সংরক্ষণের দাবি পরিবেশবিদদের

  প্রতিনিধি ২০ আগস্ট ২০২৬ , ৭:০১:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ

বিলুপ্তির পথে সাদা বক সংরক্ষণের দাবি পরিবেশবিদদের।

মোঃ আব্দুর রব মনসুর,কাজিপুর উপজেলা প্রতিনিধি:
ওই দেখা যায় তাল গাছ, ওই আমাদের গাঁ। ওই খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা’ —ছোট বেলায় পাঠ্যবইয়ের পাতা উল্টিয়ে যখন কবিতার চরণগুলো পড়তাম, তখন গ্রামের খাল-বিলের ধারে একদল সাদা বক খেলা করছে, এমন দৃশ্য ভেসে ওঠতো।
এই তো কয়েক বছর আগেও ছিল সাদা বকের বিচরণ। সকাল বেলা পুকুর পাড়ে, বিল ও খালের ধারে, ক্ষেতের পাশে শিকারের অপেক্ষায় নিশ্চুপ বসে থাকা সাদা বকটিকে দেখে মনের অজান্তেই ভাললাগা শুরু হতো। তবে এখন আর কবিতার চরণের সঙ্গে বাস্তবে গ্রামের খাল-বিলে সেই দৃশ্যপট চোখে পড়ে না। কেননা, সেই লম্বা ঠোঁটের অধিকারী বকের আবাসস্থলে মানুষ দিচ্ছে হানা। আর এতেই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে ‘বক’।একসময় আকাশে সারি বেঁধে উড়ে চলা কিংবা বিলের ধারে এক পায়ে ভর দিয়ে মাছ শিকারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য গ্রামবাংলায় নিত্যদিনের রূপ থাকলেও, আজ তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
উপকূলীয় ও গ্রামীণ কবি-সাহিত্যিকদের কবিতায় উঠে আসা এই নান্দনিক পাখিটি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাবারের সন্ধানে আর খাল-বিলে আসে না। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন, গাছপালা নিধন, অবাধে বিলে পানি না থাকা এবং অসাধু শিকারিদের দৌরাত্ম্যই এই পাখি বিলুপ্তির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
উল্লেখ্য, বকের বৈজ্ঞানিক নাম (Ardea alba), (ইংরেজি: (EGRET)। বাংলাদেশে ১৮ প্রজাতির বক রয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি বগা (ছোট বগা, মাঝলা বগা, প্রশান্ত শৈল বগা, বড় বগা ও গো বগা), ৯টি বক (ধুপনি বক, দৈত্য বক, ধলপেট বক, লালচে বক, চীনাকানি বক, দেশি কানি বক, কালোমাথা নিশি বক, মালয়ী নিশি বক, ক্ষুদে নিশি বক) এবং চারটি বগলা (খয়রা বগলা, হলদে বগলা, কালা বগলা, বাঘা বগলা)। আকারে বক ৪৫ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের পা ও লম্বা ঠোঁট ছাড়া সারা দেহ সাদা পালকে আবৃত। বক একসঙ্গে তিন থেকে সাতটি ডিম দেয়। ডিম দেওয়ার সপ্তাহের ভেতর ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। বক সাধারণত মাছ ও পোকামাকড় বেশি খায়। ফসলের পোকা খেয়ে কৃষকের অনেক উপকার করেন।
চালিতাডাঙ্গা ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান তারা সরকার জানান, কয়েক বছর আগেও এলাকার বিভিন্ন খাল-বিলে অজস্র বক দেখা যেত, যা দেখতে আশপাশের গ্রামের মানুষ ভিড় জমাত। গান্ধাইল আলী আহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বিএসসি বলেন, খাল-বিলে, নদী-নালায় একসময় প্রচুর বক দেখা গেলেও এখন শিকার ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে তা শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে।
পাখি প্রেমী ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বক প্রকৃতির বন্ধু। আর বিশ্বে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি খুব গুরুত্ব পাচ্ছে। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন, কিটনাশক ব্যবহার কমিয়ে আনতে পারলে মাছ ও পোকামাকড় খেয়ে বক বেঁচে থাকতে পারে। সুন্দর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র বাঁচিয়ে রাখার জন্যে আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহারের বিকল্প নেই। এ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে শস্য উপকারী পাখি ফসলি জমি থেকে ক্ষতিকর পোকামাকড় নির্ভয়ে খেয়ে ফেলার সুযোগ পাবে। এতে করে মাটি তার পরিপূর্ণ পুষ্টি পাবে, ফসলও ভাল ফলবে। আর কৃষক হবে লাভবান অন্যদিকে রক্ষা হবে দেশি বকের এই অভয়ারণ্য।
কাজিপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ দিদারুল আহসান জানান, মিঠাপানির খাল-বিল, পুকুর ও ডোবায় বাস করা এই পাখি মূলত মাছ, পোকামাকড়, শামুক ও ব্যাঙ খেয়ে বেঁচে থাকে। শস্যখেতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ এবং নদী-বিল ভরাটের ফলেই বক আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST