আন্তর্জাতিক

নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার শুরু, পরিণতি কী?

  প্রতিনিধি ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৯:১১:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক ডেক্স:
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্টে’র মেয়াদ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শেষ হওয়ার কথা। এর মধ্য দিয়ে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিদ্যমান অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির অবসান হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডারের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন একটি নতুন পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার পথ খুলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সীমাহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তির অবসান হলে নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে চীনের অস্ত্র ভাণ্ডারও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ ব্যাপারে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ওয়াশিংটন সম্মত হলে আরও এক বছরের জন্য চুক্তির বিধিনিষেধ মেনে চলতে তিনি প্রস্তুত।

তবে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে এখনও সুস্পষ্ট অবস্থান নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এদিকে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার তুলনামূলক ছোট হলেও ক্রমেই এর পরিসর বাড়ছে। তবে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপে বরাবরই আপত্তি জানিয়ে আসছে বেইজিং।

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর কোনো সীমা না থাকলে বিশ্ব আরও ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড্যারিল কিমবল বলেন, চুক্তির মেয়াদ ধরে রাখার বিষয়ে সমঝোতায় ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পক্ষকে আরও বেশি অস্ত্র মোতায়েনের ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারে। আমরা এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে প্রায় ৩৫ বছর পর প্রথমবারের মতো দুপক্ষই নিজেদের মোতায়েন করা পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নয়, চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করে একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও বিপজ্জনক ত্রিমুখী অস্ত্র প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও চীনও তার প্রাণঘাতী পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াচ্ছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পুতিন বারবার রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, মস্কো তার নিরাপত্তা স্বার্থে ‘সব ধরনের উপায়’ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত।

তবে ২০২৪ সালে তিনি একটি সংশোধিত পারমাণবিক নীতিতে সই করেন, যার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমা আরও কমানো হয়।

নিউ স্টার্ট চুক্তির মূল বিষয়াবলি

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ নিউ স্টার্ট চুক্তিতে সই করেন। এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং সর্বোচ্চ ৭০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমারু বিমান ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। চুক্তিটির মূল মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালে; তবে সে সময় এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়।
চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপকভাবে সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ২০২০ সালে তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুতিন এই পরিদর্শনের বিষয়ে আপত্তি জানান।
তার যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার প্রেক্ষাপটে মার্কিন পরিদর্শকদের রাশিয়ার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। একইসঙ্গে ক্রেমলিন এও জানায়, তারা পুরোপুরি চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে না এবং চুক্তি মোতাবেক পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নির্ধারিত সীমা মেনেই চলবে তারা।
এরপর গত সেপ্টেম্বরে নিউ স্টার্টের সীমা আরও এক বছরের জন্য বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে পুতিন বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা অস্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তারকে উসকে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তিটির প্রধান আলোচক ও ন্যাটোর সাবেক উপ-মহাসচিব রোজ গোটেমোলার বলেন, চুক্তির মেয়াদ বাড়ালে তা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই হবে। গত মাসে এক অনলাইন আলোচনায় তিনি বলেন, ‘নিউ স্টার্টের মেয়াদ এক বছরের জন্য বাড়ালে চীনের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেগুলোর কোনো ক্ষতি হবে না।

ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রকল্প ও উদ্বেগ

পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করার সম্ভাব্য ঘোষণা রাশিয়া ও চীনকে উদ্বিগ্ন করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং অন্য দেশকেও এর অনুসরণে প্রলুব্ধ করবে।
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি একটি নির্বাহী আদেশে গোল্ডেন ডোম প্রকল্প বাস্তবায়নের আদেশ দেন ট্রাম্প। এরপর ২৫ মে ওভাল অফিস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সিস্টেমের ঘোষণা ও পরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করেন, যেখানে প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়নে তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কথা জানানো হয়।
গোল্ডেন ডোম’ এমন একটি প্রস্তাবিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে দূরপাল্লার বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত। এর কাঠামোতে উন্নত রাডার, সেন্সর নেটওয়ার্ক ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে, যা আঘাত হানতে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।
এই সিস্টেম শুধুমাত্র প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করেই থামবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাও বাড়াবে। কারণ এটি প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা ও ক্ষমতা সীমিত করার মতো সক্ষমতা রাখবে।

কোন দিকে যাচ্ছে বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্র কূটনীতি

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ‘সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন মেদভেদেভ। তার মতে, আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক কৌশলগত অস্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা রাশিয়া ও চীন উভয় দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে বলে মত কিমবলেরও। তার ভাষ্য, তারা সম্ভবত গোল্ডেন ডোমের জবাবে তাদের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের সংখ্যা বাড়াবে, যাতে তারা (যুক্তরাষ্ট্রের) প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে পাল্টা পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
রাশিয়া সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগে ১৯৯০ সালে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিষয়ে পুতিন বলেছেন, যদিও উভয় দেশ একটি বৈশ্বিক চুক্তিতে সই করেছে যা এসব পরীক্ষা নিষিদ্ধ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষা শুরু করলে রাশিয়াও একইভাবে জবাব দেবে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট গত নভেম্বরে বলেছিলেন, এ ধরনের পরীক্ষায় পারমাণবিক বিস্ফোরণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। তবে কিমবলের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় এই পরীক্ষা শুরুর পদক্ষেপ ‘পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় একটি বিশাল ফাটল সৃষ্টি করবে’। এতে রাশিয়াও পাল্টা জবাব দিতে বাধ্য হবে এবং চীন ও ভারতসহ অন্য দেশগুলোও তা অনুসরণে প্রলুব্ধ হবে।
এই পারমাণবিক অস্ত্র কূটনীতিকের মতে, এটি বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার একটি ভয়াবহ বিপজ্জনক পর্বে প্রবেশের সম্ভাব্য মোড়চিহ্ন। এমন পরিস্থিতি আমরা আমাদের জীবদ্দশায় এর আগে দেখিনি।
নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ট্রাম্পের গোল্ডেন ডোম পরিকল্পনার মতো নতুন পদক্ষেপগুলো বৈশ্বিক পারমাণবিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, তা হবে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিশ্ব শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সূত্র: ইউএনবি

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST