প্রতিনিধি ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ৮:৫৩:০৯ প্রিন্ট সংস্করণ
বিবিসি বাংলা:
বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুরের একটি আসন থেকে জয়ী হন বিএনপি নেতা আ ন ম এহসানুল হক মিলন। নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপি যে সরকার গঠন করেছে, সেখানে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
মিলন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই বিএনপি মন্ত্রিসভা গঠন ঘিরে যখন কৌতুহল তৈরি হয়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গিয়েছিল এক ধরনের আলোচনা। তখন অনেককেই বলতে দেখা গেছে, বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন সাবেক এই শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।
শেষ পর্যন্ত সেই ধারণাই সঠিক হয়েছে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রায় ২৫ বছর পর একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। একই সঙ্গে তাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০০১ সালে প্রয়াত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের পর মিলনকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
দায়িত্ব নেওয়ার পর মিলনের ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেশে নানা আলোচনা তৈরি করেছিল। একদিকে তিনি যেমন পরীক্ষায় নকল রোধে নানা কৌশল নিয়েছিলেন, তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগও নিয়েছিলেন।
সে সময় তার এই পদক্ষেপের কারণে তখনকার বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হারও কমে গিয়েছিল অনেক। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পাবলিক পরীক্ষায় নকল বিরোধী অতীত তৎপরতার কারণেই মিলনকে ঘিরে এবারও ব্যাপক আলোচনা হয়।
তবে, হেলিকপ্টারে চড়ে নকল ধরা কিংবা সে সময়ের তার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও তৈরি হয়েছিল।
নতুন করে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরই বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেন মিলন।
এসময় অতীত আভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নকল ও প্রশ্নফাঁস আর ফিরে আসবে না। অতীতে দায়িত্ব পালনকালে নকল ও প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল; নকল ও প্রশ্নফাঁস আর ফিরে আসবে না বলে আমার বিশ্বাস।’

এছাড়াও শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে তিনি আরো কিছু পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন।
এবার একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা-১৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ।
শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে এত আলোচনা কেন?
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর ১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
হফলনামার তথ্য অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৫৭ সালের পহেলা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। হলফনামায় তিনি জানিয়েছেন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকলেও সেটি তিনি পরিত্যাগ করেছেন।
এতে তিনি উল্লেখ করেন, তার বিরুদ্ধে মোট ৩২টি মামলার মধ্যে ১৩টি মামলা এখনো বিচারাধীন আর ১৯টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন তিনি।
এর আগে একই আসন থেকে ২০০১ সালে তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার।
সেই সরকারের আমলে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওসমান ফারুককে। আর একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন এহসানুল হক মিলন।
দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মাথায় তিনি বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন তিনি এসএসসি, এইচএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াতেন।
অনেকটা গোপনে হঠাৎ করেই ছুটে যেতেন পরীক্ষার হলে। কখনো কখনো পরীক্ষার হলে ঢুকে নিজ হাতে নকল ধরতেন।
সেই সময় পরীক্ষায় নকলের বিষয়টি নেতিবাচকভাবে আলোচনায় চলে আসার কারণে তিনি এই কৌশল নিয়েছিলেন বলেই মনে করেন অনেকে।
তখন এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছাতে তিনি নিজের অর্থে ভাড়া করা হেলিকপ্টারও ব্যবহার করতেন। যে কারণে অনেকে মজা করে তার নাম দিয়েছিলেন ‘হেলিকপ্টার মিলন।
নকল বন্ধে মিলনের এই উগ্যোদের কারণে পরীক্ষায় পাশের হার হঠাৎই অনেক কমে এসেছিল।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় গড় পাশের হার দাঁড়িয়েছিল ৪৪ শতাংশের কিছু বেশি।
মঙ্গলবার মিলন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেককেই ফেসবুকে বিভিন্ন রকম কৌতুকপূর্ণ স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে।
যেমন শোয়াইব রহমান নামে একজন লিখেছেন- ‘বাচ্চারা পড়তে বসো, এখন আবার শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন।
কেউ কেউ আবার লিখেছেন- ‘শিক্ষামন্ত্রী এখন মিলন স্যার, পড়াশোনায় মন দেও বাচ্চারা, অটো পাশের দিন কিন্তু একেবারেই শেষ’।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য পদে শপথ গ্রহণের সময় ভিড় ঠেলে সংসদে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয় তার।
পরে তড়িঘড়ি করে তাকে সংসদের টানেল দিয়ে ঢোকার সময় একটি লোহার ব্যারিকেড থেকে লাফ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে সেই প্রসঙ্গ তুলে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন এবার শিক্ষাখাতে এ রকম কিছু হবে কি না। এমন প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের এডুকেশন সেক্টরে শুধু হাইজাম্প না, পোল ভল্ট জাম্প দিতে হবে, এটাই আমি বিশ্বাস করি।’
শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শপথ নেওয়ার পরদিনই বুধবার সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
এসময় শিক্ষামন্ত্রী মিলন বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও বিশ্বমানের করতে সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারিকুলাম পর্যালোচনা করা হবে, ডিজিটাল লিটারেসি ও ইংরেজি দক্ষতায় গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী ন্যানো টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক্স শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ লেখাপড়া শেষে কর্মসংস্থান, তার আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সাজানো হবে।’
সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ব্যাকডেটেড শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এগোনো যাবে না। বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ-আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা ও আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়নে কাজ করা হবে।
এই সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চান সাংবাদিকরা। জবাবে মিলন বলেন, অতীতে কে-কী করেছে, তার জবাবদিহি আমরা দেবো না। তবে আমাদের বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতি হয়নি এবং এবারও হবে না।’


















Design & Developed by BD IT HOST