আন্তর্জাতিক

এত কিছু করেও নোবেল পেলাম না: ট্রাম্প

  প্রতিনিধি ১০ অক্টোবর ২০২৬ , ৮:০২:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ

এত কিছু করেও নোবেল পেলাম না: ট্রাম্প

অনলাইন ডেক্স:
নোবেল শান্তি পুরস্কার না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুরস্কারজয়ী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন, তাকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নরওয়ের জন্য ‘মুছে ফেলা যায় না এমন কলঙ্ক’ হয়ে থাকবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের সিরাকিউজে এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পিল্লাই কী করেছেন, তা তিনি জানেন না। নরওয়েকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প আরও বলেন, আপনারা যে আমাকে এই পুরস্কার দেননি, তা আমরা ভুলব না।
এর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টেও নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি দাবি করেন, আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন, আরও দুটি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর কাছাকাছি রয়েছেন, ইসরাইলি জিম্মিদের সবাইকে ফিরিয়ে এনেছেন এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছেন। এসব কারণে তার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্য, আমি আটটি যুদ্ধের নিষ্পত্তি করেছি, আরও দুটি যুদ্ধের অবসান ঘটানো বা মীমাংসা করার কাছাকাছি রয়েছি। ইসরাইলের সব জিম্মিকে ফিরিয়ে এনেছি, যার মধ্যে শেষ ২৮ জনও রয়েছেন—জীবিত ও মৃত উভয়ই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত জিম্মিকে মুক্ত করে তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় একটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছি এবং দেশটিকে নির্মমভাবে শাসন করা সহিংস স্বৈরশাসককে আটক করেছি। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রেখেছি। আরও অনেক কিছু করেছি। তারপরও আমি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলাম না। বাহ!
তবে ট্রাম্পের আটটি সংঘাতের অবসান ঘটানোর দাবির সবকটির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। কয়েকটি সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, আর অন্য কিছু ক্ষেত্রে সংঘাতের অবসানে অন্য পক্ষগুলোর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল। তাকে পুরস্কার না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে নরওয়ে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য ‘কলঙ্কজনক ও বিব্রতকর’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।
নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে তিনি দাবি করেছেন, এ পুরস্কারের জন্য তিনিই যোগ্য। এমনকি পুরস্কার নিয়ে নরওয়ের নেতাদের ওপরও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার্তা পাঠানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।
তবে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস শনিবার বলেন, পুরস্কার প্রদানকারী কমিটি নরওয়ের সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে। আলফ্রেড নোবেলের উইলে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী পুরস্কারপ্রাপকদের সম্মানিত করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব।
ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ফ্রাইডনেস বলেন, এই পুরস্কারের উদ্দেশ্য হলো এমন একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানো, যিনি সাহস ও সততার সঙ্গে আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক আইনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়তে চাইলে আমাদের সমাজ ও বিশ্বকে সেই দিকেই এগোতে হবে।
নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি দেশটির সরকারের অংশ নয়। যদিও কমিটির সদস্যদের নিয়োগ দেয় দেশটির সংসদ এবং সংসদের রাজনৈতিক গঠন অনুযায়ী কমিটিতে প্রতিনিধিত্ব থাকে।

কে এই নাভি পিল্লাই?

এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
পিল্লাইয়ের কর্মজীবনে রয়েছে রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের গণহত্যার তদন্তে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব দেওয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি সহায়তা করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন। গত বছর তিনি জাতিসংঘের একটি কমিশনের নেতৃত্ব দেন, যে কমিশন গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ইসরাইল অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমানে পিল্লাই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মামলাটিতে দেশটির সামরিক শাসিত সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে।
পুরস্কার পাওয়ার খবর প্রকাশের পর শুক্রবার করতালির মধ্যে রসিকতা করে পিল্লাই বলেন, আপনারা যদি আরেকটু বেশি করতালি দেন, তাহলে হয়তো পুরস্কারটি ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।
পরে তিনি যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিদের উদ্দেশে পুরস্কারটি উৎসর্গ করেন। কমিটি তার সাহসের প্রশংসা করায় বিস্ময় প্রকাশ করে পিল্লাই বলেন,সত্য কথা বলতে সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?’
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালনের বিরুদ্ধে হুমকিরও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা।
পিল্লাই পুরস্কার পাওয়ার দিনই আইসিসির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য ‘বেপরোয়া আদালতটি’ যে হুমকি তৈরি করেছে, তা বন্ধ করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অসলোভিত্তিক স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলো বলেন, পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার দিনই আইসিসির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঘটনা এ পুরস্কারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
তিনি বলেন, কমিটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক আইন এবং তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শান্তিপূর্ণ বিশ্বের অপরিহার্য ভিত্তি। কমিটির সিদ্ধান্তটি সাহসী এবং এর জবাবে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা উদ্বেগজনকভাবে দাদাগিরিমূলক।
এদিকে, ট্রাম্পের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশ ও ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন বা মনোনয়ন দিয়েছেন। গত বছরের শান্তি পুরস্কারজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনীতিক মারিয়া কোরিনা মাচাদোও জানুয়ারিতে নিজের পদক ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন। তার কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের নেতা নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, পুরস্কার একবার দেওয়া হলে তা বাতিল, ভাগ কিংবা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST