সারাদেশ

বান্দরবানের লামায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ি শিশুদের স্কুলযাত্রা

  প্রতিনিধি ৯ অক্টোবর ২০২৬ , ৭:১১:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ

বান্দরবানের লামায় মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ি শিশুদের স্কুলযাত্রা

অনলাইন ডেক্স:
বান্দরবানের লামায় বমু খালের উপর কোনো সেতু না থাকায় তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এসব পাহাড়ি শিশুর কারও কাঁধে থাকে স্কুলের ব্যাগ, কারও বা হাতে বই-খাতা।
কখনো অভিভাবকের কোলে চড়ে, আবার কখনো ভিজে ভিজে তীব্র স্রোতের খাল পার হয়েই বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অসুস্থ রোগীদেরও চিকিৎসকের কাছে নিতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে চরম বিপাকে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীরা জানান, লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তির নাম এই বমু খাল।
খালের দুই পাড়ে অবস্থিত বাইশফারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিত্তাবানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই পথেই যাতায়াত করে। খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় বর্ষা মৌসুমে শিশু, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়লে পারাপার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে; তখন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসাও বন্ধ হয়ে যায়।
চিত্তাবানপাড়া ও বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী পাউঙি ম্রো এবং পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মাংইয়ং ম্রো বলে- প্রতিদিন এই খাল পার হয়ে স্কুলে আসতে হয় আমাদের। পানিতে কখনো বই ভিজে যায়, কখনো পোশাক ভিজে যায়। পানি বেশি থাকলে খুব ভয় লাগে, তখন কেউ স্কুলে আসতে পারি না। এখানে একটা সেতু হলে আমাদের অনেক সুবিধা হতো।
যোগাযোগের এই সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে স্থানীয় পাহাড়ি কৃষিতেও। কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ গুনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নয়াপাড়া ও মুরুংপাড়ার বাসিন্দা উচহ্লা ও সিংপাক ম্রো বলেন, আমাদের অনেকেই জুম ও কৃষিকাজ করে সংসার চালান; কিন্তু কোনো ব্রিজ না থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা এলাকায় আসতে চান না। ফলে কষ্ট করে কৃষিপণ্য অনেক দূর নিয়ে বিক্রি করতে হয়, ন্যায্যমূল্যও পাই না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গজালিয়া ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্তাবানপাড়া, পশ্চিম বাইশফারি, নয়াপাড়া, তুলাতলী মুরুং, মারমা পাড়া, ঢেঁকিছড়া ও হেডম্যানপাড়াসহ সাতটি গ্রামে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। যাদের বেশিরভাগই ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর এবং তারা প্রধানত কৃষিনির্ভর। বমু খালের এপারে বাইশফারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ওপারে রয়েছে চিত্তাবানপাড়া ও বড়থলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সরেজমিন দেখা যায়, বান্দরবান-লামা সড়কের মধ্যবর্তী অংশ থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বুক চিরে বয়ে গেছে প্রায় ১৮০ ফুট প্রশস্ত এই বমু খাল, যা সরাসরি চিম্বুক এলাকার সঙ্গে যুক্ত। খালের একদিকে তিনটি ও অন্যদিকে চারটি গ্রাম। খালের স্রোত কখনো হাঁটুসমান, আবার কখনো তীব্র রূপ নেয়। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে অভিভাবকরা সন্তানদের কোলে নিয়ে সন্তর্পণে খাল পার হন। কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনেও এই খালের ওপর দিয়েই চলাচল করতে হয় সবাইকে।
বাইশফারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাকির হোসাইন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য বমু খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। খালের পানি বাড়লেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়।
বাইশফারির স্থানীয় এনজিও কর্মী অংথোয়াইনু মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্রিজ হবে বলে বহুবার লোকজন এসে মাপজোখ করে গেছে। ফিতা টেনে দাগ দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।
এ বিষয়ে গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উচাছিং মারমা বলেন, এখানে একটি সেতু নির্মাণ খুবই জরুরি। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ সীমিত হওয়ায় এত বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী রনি সাহা জানান, সেতুটি ওই এলাকার মানুষের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST