সারাদেশ

দেশীয় ফল গাব আজ বিলুপ্তির পথে: সংরক্ষণের তাগিদ

  প্রতিনিধি ১৬ আগস্ট ২০২৬ , ২:২১:১২ প্রিন্ট সংস্করণ

দেশীয় ফল গাব আজ বিলুপ্তির পথে: সংরক্ষণের তাগিদ

মোঃ আব্দুর রব মনসুর,কাজিপুর উপজেলা প্রতিনিধি:

বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা দেশি ফল গাব আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। বিদেশি ফলের আধিক্য, বনভূমি উজাড় এবং চরম অবহেলায় একসময়ের পরিচিত এই ফলটি ধীরে ধীরে জনপদ থেকে বিলুপ্ত হতে বসেছে।
গাব বাংলাদেশের একটি প্রাচীন দেশীয় ফল, যার বৈজ্ঞানিক নাম *Diospyros malabarica*। ফলটি মূলত জলাভূমি ও আর্দ্র পরিবেশে ভালো জন্মে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও নদী-খালবেষ্টিত এলাকায় একসময় প্রচুর গাবগাছ দেখা যেত। গাছটি আকারে বেশ বড় ও দীর্ঘজীবী হয় এবং বছরের অধিকাংশ সময় সবুজ পাতায় ভরপুর থাকে। বর্ষাকালে গাছে ফল ধরতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তা পরিপক্ব হয়।

**গাব ফল বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহ:**

**বনভূমি উজাড়:**

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও গাছপালা কেটে ফেলার ফলে গাব গাছের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

**বাণিজ্যিক চাষের অভাব:**

বাজারে এর কোনো বাণিজ্যিক চাহিদা বা বড় পরিসরে উৎপাদন ও বিপণন নেই।

**নতুন চারা রোপণ না করা:**

মানুষ শখ করেও আর গাব গাছের চারা রোপণ বা পরিচর্যা করছে না।

**অযত্ন ও অবহেলা:**

গাছগুলোর কোনো ধরনের যত্ন নেওয়া হয় না এবং পুরনো গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

**জলবায়ু পরিবর্তন:**

প্রকৃতির পালাবদল ও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবেও এই গাছ টিকতে পারছে না।
একসময় গ্রামবাংলার ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল, খালপাড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় সহজেই গাবগাছ দেখা যেত। বর্ষা এলে ডালে ডালে ঝুলে থাকা গোলাকার সবুজ ফল পাকার পর হলুদাভ বা কালচে রঙ ধারণ করত। শিশু-কিশোররা গাছ থেকে পেড়ে বা নিচে পড়ে থাকা পাকা গাব কুড়িয়ে খেত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক ফলের বাজারে স্থান হারিয়ে গাব যেন নিঃশব্দে বিদায় নিচ্ছে প্রকৃতি থেকে।

**ওষুধি ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব:**

গাব শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, এর রয়েছে নানা ওষুধি গুণও। লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে গাবের ফল, ছাল ও পাতা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মতে, গাবের কাঁচা ফল আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে বেশ সহায়ক। এর ছালে থাকা ট্যানিনজাতীয় উপাদান প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং অনেক এলাকায় ক্ষতের চিকিৎসায়ও এর নির্যাস ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ফলটিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
শুধু ফল বা ওষুধি গুণই নয়, গাবগাছের কাঠ বেশ শক্ত ও টেকসই হওয়ায় গ্রামীণ এলাকায় আসবাবপত্র ও কৃষিকাজের সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। অতীতে গাবগাছের আঠা নৌকা নির্মাণে জলরোধী হিসেবে এবং মাছ ধরার জাল ও দড়ি সংরক্ষণে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
মাথাইচাপড় গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘বাজারে কিনে খাওয়ার চেয়ে গাছ থেকে পেড়ে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। আম, কাঁঠাল ও জামের পাশাপাশি গাবও ছিল শিশুদের খুব প্রিয়। বিদ্যালয় ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে গাব কুড়ানোর স্মৃতি আজও অনেকের মনে রয়েছে।

**পরিবেশগত প্রভাব ও সংরক্ষণের দাবি:**

পরিবেশগত দিক থেকেও গাবগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকৃতির এই গাছ ছায়া দেয়, পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখে। নদী ও খালপাড়ে জন্মানো গাবগাছ মাটির ক্ষয়রোধেও সহায়তা করে। তাই গাবগাছ হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল একটি ফলের বিলুপ্তি নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যবস্থার দুর্বল হয়ে পড়া।
দেশীয় এই ফল সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গাবের চারা উৎপাদন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST