গনমাধ্যাম

ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়ে দশমিনায় সাংবাদিক রাকিবের মৃত্যু

  প্রতিনিধি ৩১ মে ২০২৬ , ৮:৪৫:২২ প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ আবেগঘন স্ট্যাটাস দেওয়ার পর পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার সংবাদকর্মী মো. রাকিব হোসাইন (২৮) মারা গেছেন। আজ রোববার ভোরে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি জাতীয় দৈনিক ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার দশমিনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

নিহত রাকিবের পৈতৃক বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস এলাকায়। তিনি ওই এলাকার মো. মোক্তার হোসেন মেলকারের ছেলে। তবে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর নানাবাড়ি দশমিনায় বসবাস করছিলেন। তাঁর মামা শওকত হোসেন দশমিনা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। পেশাগত জীবনের শুরুতে রাকিব দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় কাজ করলেও পরবর্তীতে তিনি দৈনিক যায়যায়দিনের দশমিনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে দশমিনা প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি, সাংবাদিক সমিতি এবং বাউফল প্রেসক্লাব গভীর শোক প্রকাশ করেছে।

মৃত্যুর আগে ফেসবুকে অবহেলার আর্তনাদ:

স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার ভোর চারটার দিকে রাকিব তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি জীবনের নানা যুদ্ধ ও ক্লান্তির কথা তুলে ধরে লেখেন, একটা মানুষ জীবনে কত যুদ্ধ করতে পারে, যুদ্ধ করতে করতে আজ আমি ক্লান্ত। নিজের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি চরম আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, আফসোস এটাই যে রক্তের সম্পর্কের মানুষ গুলো আমাকে চিনতে পারলো না! দুনিয়ার মায়া এক দিনের বা অল্প কষ্টে কেউ ছাড়েনা।

শেষ ইচ্ছা ও মায়ের কবরের পাশে দাফন:

ফেসবুক পোস্টে রাকিব তাঁর মৃত্যুর পর মায়ের পাশে দাফন করার আকুতি জানিয়েছিলেন। আজ রোববার বেলা পৌনে ১১টার দিকে দশমিনা মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ রাঙাবালীর চরবিশ্বাস এলাকার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী মায়ের কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

এছাড়া ফেসবুক পোস্টে ‘শাজাহান মেলকার’ নামের এক ব্যক্তির পরিবারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন, তাদের যেন কোনো সদস্য তাঁর মৃতদেহ না দেখে। কেউ দেখলে বা দেখালে তার প্রতি ‘কেয়ামত পর্যন্ত দাবী’ থাকবে বলেও উল্লেখ করেন।

দশমিনা ফার্মেসীর ব্যবসা ও লেনদেনের হিসাব:

রাকিব স্থানীয় ‘দশমিনা ফার্মেসী’র একজন অংশীদার ছিলেন বলে ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা যায়। দোকানের খাতায় তাঁর দেওয়া সমস্ত আর্থিক হিসাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, গৌতম নামের এক ব্যক্তি যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন। গৌতমকে একজন ভালো ছেলে হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, তাঁর ছোট বোন জান্নাতুল ফেরদাউস (এলো) যেন গৌতমের কাছ থেকে সব হিসাব বুঝে নেয়।

শৈশবের কষ্ট ও সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা:

ছোটবেলা থেকেই পরিবার ছাড়া বড় হয়েছেন দাবি করে রাকিব ফেসবুকে লেখেন, রক্তের সম্পর্কের মানুষের কাছ থেকে তিনি শুধু অবহেলাই পেয়েছেন। তবে জীবনের চলার পথে যারা তাঁকে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। স্ট্যাটাসের শেষ অংশে তিনি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে লেখেন, *”চলার পথে যদি কেউ আমার আচরণে কষ্ট পেয়ে থাকেন আমাকে মাফ করে দিবেন। পরিশেষে দুঃখের ঘরে জন্ম নেয়া, কষ্টের সাথে বেড়ে ওঠা ছেলেটার জীবনের সমাপ্তি ঘটে।

যেভাবে উদ্ধার করা হয়:

স্থানীয়রা জানান, ভোরে ফেসবুক স্ট্যাটাসটি চোখে পড়ার পর পরিচিতজনেরা দ্রুত উপজেলা সদরের মানিক মিয়া চত্বরে রাকিবের ভাড়া বাসায় ছুটে যান। তিনি ওই বাসায় একাই থাকতেন। সেখান থেকে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে দশমিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে নেওয়ার পথে সকাল পাঁচটার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি বাবা, দুই বোন ও এক ভাইসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

আরও খবর

Sponsered content

Design & Developed by BD IT HOST