আন্তর্জাতিক ডেক্স:
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহর মধ্যেই পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরির নিচকাসবা গ্রাম পঞ্চায়েতের হিজলি শরিফ এলাকায় আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠছে। ৬০টিরও বেশি দোকান পুড়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসতেই রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র চাপা উত্তেজনা।
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি সমাজমাধ্যমে সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে দাবি করেছেন, ‘এটাই বিজেপির রাজনীতির আসল চেহারা-ঘৃণা, ভয় দেখানো এবং ধ্বংস।’
তার অভিযোগ, এই হামলায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়েছে এবং বাংলার সামাজিক সম্প্রীতির ওপর পরিকল্পিত আঘাত হানা হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, গভীর রাতে একাধিক দোকানে আগুন লাগানো হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যবসায়ীদের বছরের পর বছর গড়ে তোলা রুজিরুটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছাই হয়ে গেছে। এতে সামাজিক উদ্বেগও বাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে বাংলার রাজনীতিতে কি নতুন করে ‘ভয়ের রাজনীতি’ প্রবেশ করতে চলেছে?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের সংঘাতপূর্ণ নির্বাচনি রাজনীতির পর যদি ক্ষমতার পরিবর্তনের আবহে এভাবে গ্রামীণ এলাকায় সহিংসতা ছড়ায়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বার্তা বহন করে। ঘটনার পর এলাকায় বড় পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, তদন্ত শুরু হয়েছে এবং আগুন লাগার পেছনে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে, পাশাপাশি ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের তালিকা তৈরির কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে বিজেপি অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলেও বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে।
এতে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এবং সেটি হচ্ছে- বাংলা কি আবার অশান্তির রাজনীতির দিকে এগোচ্ছে? দোকানগুলো শুধু ইট-কাঠের কাঠামো ছিল না; বহু পরিবারের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার লড়াই এবং ভবিষ্যতের ভরসাও সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে দিল্লির কড়া বার্তা, নতুন চাপ ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে: স্পর্শকাতর বিষয় ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে আবারও কড়া কূটনৈতিক বার্তা দিল নয়াদিল্লি। ভারতের দাবি, গত কয়েক বছরে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হলেও বাংলাদেশ সরকার সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করেনি।
দিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, এই জটিলতা শেখ হাসিনার আমল থেকেই চলমান। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঢাকাকে পাঠানো
এক নথিতে উল্লেখ করেছে যে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত এক হাজারেরও বেশি কূটনৈতিক ‘নোট’ এবং অন্তত ৪৫৬ বার অনুস্মারক পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন বলে যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের নাগরিকত্ব যাচাই করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এতে অগ্রগতি নেই। এই নথি পাঠানোর সময়টিও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, ৩০ এপ্রিল এই বার্তা পাঠানো হয়, ঠিক সেই সময় যখন বাংলাদেশ সরকার ভারতের কিছু রাজনৈতিক মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল।
বিশেষত অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, তার পরপরই এই কূটনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়।
ভারতের দাবি, বর্তমানে প্রায় ২৮৬২টি নাগরিকত্ব যাচাই সংক্রান্ত মামলা ঝুলে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।
দিল্লির বক্তব্য, ভারত নিজের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি বলেন, অবৈধভাবে ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি এখন ‘মূল ইস্যু’ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা অপরিহার্য।
তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই ইস্যু শুধু প্রশাসনিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি সমীকরণও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক গত এক দশকে যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে উলেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। সেই কারণে অনুপ্রবেশের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু যেন বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে প্রভাবিত না করে, সে ব্যাপারে দুই দেশকেই সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষত সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবিকা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং সামাজিক বাস্তবতা এই বিতর্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কলকাতার কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দিল্লির সাম্প্রতিক বার্তা মূলত প্রশাসনিক চাপ বাড়ানোর কৌশল হলেও, দুই দেশই প্রকাশ্যে সংঘাতের পথে যেতে চাইবে না।
কারণ ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত সম্পর্ক এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে।
তবে এটাও স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দিল্লির নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক অবস্থানের ফলে সীমান্ত ও অনুপ্রবেশ ইস্যু আগামী দিনে আরও বেশি করে আলোচনায় আসতে চলেছে।
সেই পরিস্থিতিতে ঢাকা কীভাবে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে এবং দিল্লির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজে, সেটাই এখন দেখার।
সম্পাদক : মোঃ সফিকুল ইসলাম আইন উপদেষ্টা: এ্যাডভোকেট নূরুল হক বাচ্চু
E-mail: dainik-ekattorerpata@gmail.com মোবাইল নাম্বার : 01710150103
অফিস: 147/1, মিরহাজিরবাগ (শেখ পাড়া), যাত্রাবাড়ী, ঢাকা